হাওজা নিউজ এজেন্সি রিপোর্ট অনুযায়ী, চাপিয়ে দেওয়া যুদ্ধের সময় এবং যুদ্ধোত্তর যুগে, দেশের অর্থনীতি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি সামাজিক সংহতি, ভোগের সংস্কৃতি সংস্কার এবং জনগণের অংশগ্রহণ জোরদার করার প্রয়োজন। এমন পরিস্থিতিতে, মিতব্যয়িতা ও অপচয় থেকে বিরত থাকার বিষয়ে ধর্মীয় শিক্ষাগুলো অনেক সমস্যার সমাধান দিতে পারে।
এই বিষয়ে কোমের হাওজা ইলমিয়ার অধ্যাপক ও ইসলামী বিজ্ঞানের গবেষক হুজ্জাতুল ইসলাম ওয়াল মুসলিমিন মোহাম্মদ সালেহ মোশফকিপুরের সাথে আমরা একটি সাক্ষাৎকার করেছি, যার সারসংক্ষেপ নিচে পড়তে পারেন:
পবিত্র কুরআনের আয়াত ও আহলে বাইত (আ.)-এর বর্ণনায় মিতব্যয়িতা ও অপচয়ের গুরুত্ব কী?
এটা স্পষ্ট যে ভোগ করা নিজেই একটি অনিবার্য বিষয় এবং কেউ ভোগের মৌলিক নীতির বিপক্ষে যেতে পারে না। আয়াত ও রেওয়ায়েতগুলোতেও স্পষ্টভাবে ভোগ করতে এবং আল্লাহ মানুষকে যে নিয়ামত ও সম্পদ দিয়েছেন তা ব্যবহার করতে আহ্বান জানানো হয়েছে।
এই বিষয়ে অনেক আয়াত রয়েছে, সবগুলো উল্লেখ করার সুযোগ নেই। উদাহরণস্বরূপ, পবিত্র কুরআনে শুধু "খাও" শব্দটি বিবেচনা করলেই বিভিন্ন বাক্যে দেখতে পাই: "আল্লাহর দেওয়া রিজিক থেকে খাও ও পান করো" (সূরা বাকারা, আয়াত ৬০); "পৃথিবীতে যা কিছু হালাল ও পবিত্র তা খাও" (সূরা বাকারা, আয়াত ১৬৮); "হে ঈমানদারগণ, আমি তোমাদের যে পবিত্র রিজিক দিয়েছি তা থেকে খাও" (সূরা বাকারা, আয়াত ১৭২); "আল্লাহ তোমাদের যে রিজিক দিয়েছেন তা থেকে খাও" (সূরা মায়েদা, আয়াত ৮৮); "যখন ফল দেয় তখন তার ফল থেকে খাও" (সূরা আনআম, আয়াত ১৪১); "তোমাদের চতুষ্পদ জন্তুদের চরাও এবং খাও" (সূরা ত্বোয়া-হা, আয়াত ৫৪); "পবিত্র বস্তু থেকে খাও" (সূরা মুমিনুন, আয়াত ৫১) এবং আরও অনেক আয়াত যা ভোগের মৌলিক নীতির নির্দেশ দেয়।
মূলত মহান আল্লাহ তাকে তিরস্কার করেন যে নিজের উপর আল্লাহর নিয়ামত হারাম করতে চায় এবং বলেন: "আল্লাহ তোমাদের জন্য যা হালাল করেছেন, তার পবিত্র বস্তুগুলো নিজেদের উপর হারাম করো না" (সূরা মায়েদা, আয়াত ৮৭)। তাই কেউ পারে না এবং উচিতও নয় যে ভোগের মৌলিক নীতির বিপক্ষে যাবে-এটি সুস্পষ্ট বিষয়। তবে বিষয়টি হলো, ভোগের ধরন সম্পর্কে যুক্তি ও ধর্ম উভয়েই কিছু সীমা নির্ধারণ করে দেয়।
যুক্তি ও ধর্ম ভোগের পরিমাণ, গুণমান, পদ্ধতি এবং আমরা কী ভোগ করি সে সম্পর্কে শর্ত আরোপ করে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্তগুলোর মধ্যে একটি হলো সংযম ও মধ্যপন্থা অবলম্বন করা, যা কিছু বর্ণনায় 'ইকতিসাদ' (মিতব্যয়িতা) নামে উল্লেখিত হয়েছে। যুক্তি ও ধর্ম উভয়েই জোর দেয় যে সেই ভোগই সঠিক যা 'মিতব্যয়ী' হয়। 'অপচয়ী' ভোগ এবং 'কৃপণতাপূর্ণ' ভোগ-উভয়ই ভুল। যুক্তি সংযম ও মধ্যপন্থার অবস্থান থেকে বেরিয়ে যাওয়াকে নিন্দা করে, ফলে ভোগে অপচয় ও সীমালংঘন এবং তাতে কৃপণতা উভয়কেই নিন্দা করে।
ধর্মীয় উৎসগুলিও অপচয় ও কৃপণতার বিপক্ষে এবং ভোগে মিতব্যয়িতা ও সংযমের আহ্বান জানায়। অপচয়ের বিষয়টি, যা আমাদের ইসলামী সমাজসহ বিভিন্ন সমাজে একটি বড় সমস্যা, সেখানে অপচয় নেতিবাচক এমন অসংখ্য ও স্পষ্ট আয়াত ছাড়াও এই বিষয়ে অনেক বর্ণনা রয়েছে যা বিভিন্ন দিক থেকে আলোচনা করে-যেমন অপচয়ের ফায়সালা (হুকুম), অপচয়ের অর্থ, অপচয়ের ক্ষেত্র, অপচয়ের লক্ষণ, অপচয়ের প্রভাব ও ফলাফল ইত্যাদি।
উদাহরণস্বরূপ, কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করছি:
ইমাম সাদিক (আ.) বলেছেন: "মিতব্যয়িতা এমন একটি জিনিস যা আল্লাহ ভালোবাসেন, কিন্তু অপচয় তাঁর ক্রোধের কারণ, তা একটি খেজুরের আঁটি ফেলে দেওয়ার মাধ্যমেই হোক যা কোনো কাজে লাগতে পারত, অথবা তুমি পান করার পর পানির অবশিষ্টাংশ ফেলে দেওয়ার মাধ্যমেই হোক।" (আল-কাফি, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫২)
অন্য একটি বর্ণনায় বলেছেন: "অপচয় দারিদ্র্য ও অভাব সৃষ্টি করে এবং মিতব্যয়িতা সম্পদ ও অমুখাপেক্ষা সৃষ্টি করে।" (আল-কাফি, খণ্ড ৪, পৃষ্ঠা ৫৪) আরেকটি অত্যন্ত পথপ্রদর্শক ও শিক্ষণীয় বর্ণনায় বলেছেন: "অপচয়ের সর্বনিম্ন স্তর হলো: পানপাত্রের অতিরিক্ত পানি ফেলে দেওয়া, অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের পোশাক (বাইরের অনুষ্ঠানের পোশাক নয়) পরা এবং খেজুরের আঁটি ফেলে দেওয়া।" (আল-কাফি, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৪৬০)
এই রেওয়ায়েতগুলোর ভিত্তিতেই আমরা বুঝতে পারি যে, অপচয় শুধু ভোগে সীমালংঘন করা নয়, যেমন বেশি খাওয়া, জ্বালানি অপচয় করা ইত্যাদি; বরং সম্পদ ও নিয়ামত বিনষ্ট করা ও নষ্ট করাও অপচয়ের উদাহরণ। দুর্ভাগ্যবশত বিশ্বে এবং আমাদের সমাজেও এই ধরনের অপচয় খুবই বিস্তৃত।
দুর্ভাগ্যবশত ১৪০২ হিজরি সনে (ইরানি সন) বলা হয়েছে যে আমাদের দেশের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ খাদ্য বর্জ্যে পরিণত হয়। অন্যান্য দেশের তুলনায় এই হার কম হতে পারে, তবুও এই পরিমাণ সত্যিই ভয়াবহ এবং একটি ইসলামী সমাজের জন্য এটি দোষের ব্যাপার। প্রায় ৩৫ মিলিয়ন টন কৃষিপণ্য-যা প্রায় ২০ মিলিয়ন মানুষের খাদ্যের সমান-প্রতি বছর বর্জ্যে পরিণত হয়। এটা কি সামান্য ব্যাপার?
এসব মহান আল্লাহর ক্রোধের কারণ, আল্লাহর রহমত থেকে দূরত্বের কারণ, দারিদ্র্য ও সমস্যা এবং দোয়া কবুল না হওয়ার কারণ। অপচয়ের বিষয়ে আমাদের খুব সংবেদনশীল হতে হবে। তবে এতে কোনো সন্দেহ নেই যে, দুর্ভাগ্যবশত সম্পদ অপচয় ও বিনষ্ট করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিজেই সরকারের-তাদের কু-পরিকল্পনা ও কু-ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে।
সর্ববৃহৎ ভোক্তা নিজেই রাষ্ট্র, আর সাধারণ মানুষের ভূমিকা খুব সামান্য। কিন্তু আমরা মানুষজনও নিজ নিজ জায়গায় সতর্ক থাকা এবং এই বিষয়ে সংবেদনশীল হওয়া আবশ্যক। উদাহরণস্বরূপ, আমি কোথাও পড়েছি যে দশ হাজার দানা চাল প্রায় এক কেজির সমান। যদি দেশের প্রতিটি মানুষ প্রতিদিন একটি দানা চাল ফেলে দেয়, তাহলে প্রতিদিন প্রায় আট হাজার কেজি এবং বছরে প্রায় ২৮৮০ টন চাল ফেলা হবে। সুতরাং আমরা প্রত্যেকেই এর অংশীদার। নিজ নিজ জায়গায় আমাদের সতর্ক হতে হবে এবং প্রত্যেককে নিজে থেকে এবং নিজের ঘর থেকে শুরু করে অন্যদেরকেও এই বিষয়ে উপদেশ দিতে হবে।
যুদ্ধ ও যুদ্ধোত্তর সময়ে ভোগের ধরণ সংস্কার এবং অপচয় থেকে দূরে থাকার প্রয়োজনীয়তা ব্যাখ্যা করুন
আমাদের ভোগ মিতব্যয়ী হওয়া উচিত এবং অপচয় ও কৃপণতা থেকে বিরত থাকা উচিত-এটি কোনো নির্দিষ্ট সময়ের সাথে সম্পর্কিত নয়; সব অবস্থাতেই ভোগে মধ্যপন্থী হওয়া উচিত। তবে বিষয়টি হলো, মধ্যপন্থিতা সময়, স্থান এমনকি ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়।
উদাহরণস্বরূপ, খাদ্য গ্রহণে মধ্যপন্থিতা একটি শিশু ও একটি যুবকের মধ্যে, অথবা একজন নারী ও পুরুষের মধ্যে ভিন্ন। পোশাক ও অন্যান্য বিষয়েও সাধারণত একই কথা। যেমন, উষ্ণ ও শীতল অঞ্চলের মধ্যে গরম বা ঠান্ডা জ্বালানি ব্যবহারে মধ্যপন্থিতা ভিন্ন হয়।
আমার অভিমত হলো, মধ্যপন্থিতা অবশ্যই একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ নয়, বরং এটি সময়গত, পরিবেশগত ও মানবিক অবস্থার অধীন। মধ্যপন্থী ও অপচয়হীন ভোগের ধরনকে প্রভাবিত করে এমন গুরুত্বপূর্ণ ও কার্যকরী অবস্থাগুলোর মধ্যে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি অন্যতম। একটি অস্তিত্বগত যুদ্ধে যেখানে নৃশংস ও নির্দয় শত্রু আমাদের ধর্ম, জাতি এবং দেশের অবকাঠামো ধ্বংস করতে মরিয়ম, সেখানে যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি অনুযায়ী ভোগের ধরনের প্রতি বিশেষ মনোযোগ দেওয়া সবচেয়ে জরুরি কাজগুলোর মধ্যে একটি।
একটি ভাগ্যনির্ধারক যুদ্ধের উপস্থিতিতে, সবকিছু ভোগে-বিশেষ করে বিদ্যুৎ, গ্যাস, পানি ও পেট্রল-সংবেদনশীলতা ও সতর্কতার সাথে মিতব্যয়িতা ও মধ্যপন্থা অবলম্বন করতে হবে। আর যেহেতু এটি যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি, তাই যুদ্ধকালীন মধ্যপন্থিতা অযুদ্ধকালীন মধ্যপন্থিতা থেকে ভিন্ন; এখানে শুধু সঠিকভাবে ভোগ করা নয়, বরং কম ভোগ করতে হবে।
স্পষ্ট করে বলতে হবে, আমরা যদি যুদ্ধের আগের তুলনায় এখনও জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণে কোনো পরিবর্তন না করে থাকি, তাহলে শিশুহত্যাকারী আমেরিকান-ইহুদীবাদী শত্রুর বিরুদ্ধে ইসলামী প্রজাতন্ত্র ইরানের প্রতি আমাদের সমর্থন নিয়ে সন্দেহ থাকা উচিত। যুদ্ধোত্তর সময়ের জন্যও একই কথা। ইনশাআল্লাহ, সত্যের শক্তির ওপর মিথ্যার পরাজয়ের পর, যতদিন না পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়, ততদিন ভোগে মধ্যপন্থা বজায় রাখতে হবে।
প্রতিরোধী অর্থনীতি বাস্তবায়নের জন্য বিলাসিতা ও অপচয় থেকে বিরত থাকা জরুরি
স্বাভাবিকভাবেই, অপচয় ছাড়া প্রতিরোধী অর্থনীতি বাস্তবায়ন সম্ভব নয়। এই কারণেই আমাদের শহীদ নেতা কর্তৃক ঘোষিত প্রতিরোধী অর্থনীতির সাধারণ নীতিমালার দুটি ধারায় এই বিষয়টি আলোচিত হয়েছে।
একটি হল অষ্টম ধারা, যা বলে: ভোগ ব্যবস্থাপনার ওপর জোর দিয়ে ভোগের ধরণ সংস্কারের সাধারণ নীতিমালা বাস্তবায়ন এবং দেশীয় পণ্য ব্যবহারের প্রচার। অন্যটি হল ষোড়শ ধারা, যা বলে: দেশের সরকারি ব্যয়ে সাশ্রয়, বিশেষ করে কাঠামোগত আমূল পরিবর্তন, সরকারের আকার যৌক্তিককরণ, সমান্তরাল ও অপ্রয়োজনীয় সংস্থা বিলুপ্তকরণ এবং অপচয় ব্যয় বন্ধ করার ওপর জোর দিয়ে।
অপচয় ও প্রতিরোধী অর্থনীতির প্রসঙ্গে আমাদের শহীদ নেতা এই বিষয়ে আলোকপাত করেছেন। এখানে তাঁর সেই কথাগুলো উদ্ধৃত করা উপযুক্ত। তিনি বারবার বলেছেন যে, প্রতিরোধী অর্থনীতিকে গুরুত্ব সহকারে নিতে হবে এবং দেশের সমস্যার সমাধান তিনি এই নীতিমালা বাস্তবায়ন ও অভ্যন্তরীণ সম্ভাবনার দিকে তাকানোর মধ্যে দেখতেন।
দেশের কিছু কর্মকর্তা এখনও বলেন, যদি আমরা আলোচনা ও সংলাপ না করি তাহলে আমাদের কী করা উচিত? নেতা এর উত্তর দিয়েছেন: সমাধান হলো প্রতিরোধী অর্থনীতি। দুর্ভাগ্যবশত, যথাযথভাবে তা বাস্তবায়িত হয়নি এবং আমি আশা করি, আমাদের প্রজ্ঞাবান শহীদ নেতার শাহাদাতের পর কর্মকর্তারা এই বিষয়ে আগের চেয়ে বেশি মনোযোগ দেবেন।
ভোগ ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে শহীদ নেতার বক্তব্য
ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতা ১৩৯১ হিজরি সনে (ইরানি সন) ভোগ ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে বলেছিলেন: "প্রতিরোধী অর্থনীতির আরেকটি বিষয় হলো ভোগ ব্যবস্থাপনা। ভোগও ব্যবস্থাপনা করা আবশ্যক। দেশে অপচয় ও সীমালংঘনের বিষয়টি খুব গুরুত্বপূর্ণ। এখন, কীভাবে অপচয় বন্ধ করা উচিত? সংস্কৃতি গঠনও প্রয়োজন, বাস্তব পদক্ষেপও প্রয়োজন। সংস্কৃতি গঠনের দায়িত্ব মূলত গণমাধ্যমের। এই ক্ষেত্রে সত্যিই, প্রথম ও সর্বোপরি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ও রেডিওর (সিমা ও সেদা) দায়িত্ব, অন্যান্য সংস্থারও দায়িত্ব আছে। তোমাদের সংস্কৃতি গঠন করতে হবে। আমরা ইসলামী ধারণার প্রতি অনুরাগী একটি মুসলিম জাতি, ইসলামে অপচয় কত নিষিদ্ধ, অথচ দুর্ভাগ্যবশত আমরা আমাদের জীবনে অপচয়কারী।"
শহীদ নেতা আরও বলেন: "এর বাস্তব অংশটি, আমার মতে, নিজেই সরকার থেকে শুরু হওয়া উচিত... এটাকে গুরুত্ব সহকারে নিন। সরকার নিজেই একটি বিশাল ভোক্তা। পেট্রল থেকে শুরু করে নানাবিধ উপকরণ, সরকারই একটি বড় ভোক্তা। সত্যিই সাশ্রয় করুন। সাশ্রয় একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ও গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।"
আপনার কমেন্ট